'মর্সিয়া' কি?

Updated: 4 months ago
  • আগমনী গীতি
  • শোকগীতি
  • ধর্মগীতি
  • ধর্মগীতি পল্লীগীতি
9.3k
উত্তরঃ

বাংলা মর্সিয়া সাহিত্য

নূরুল আনাম : মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে ‘মর্সিয়া সাহিত্য' নামে এক ধরনের শোক কাব্য বিস্তৃত অঙ্গন জুড়ে আছে। এমনকি তার বিয়োগান্ত ভাবধারার প্রভাব আধুনিক যুগের পরিধিতেও তা ভিন্ন আংগিকে এসে উপনীত হয়েছে। শোক বিষয়ক ঘটনা অবলম্বনে সাহিত্য সৃষ্টি বিশ্ব সাহিত্যের প্রাচীন রীতি হিসাবে বিবেচিত। ‘মর্সিয়া' শব্দটি আরবী, এর অর্থ শোক প্রকাশ করা। আরবী সাহিত্যে মর্সিয়া উদ্ভব নানা ধরনের শোকাবহ ঘটনা থেকে হলেও পরে কারবালা প্রান্তরে নিহত ইমাম হোসেন ও অন্য শহীদদেরকে উপজীব্য করে লেখা সাহিত্য মর্সিয়া নামে আখ্যায়িত হয়। মূলত : ৭৫০ খৃস্টাব্দে উমাইয়া খিলাফতের পতনের পর থেকেই এই সাহিত্য সৃষ্টির সূচনা। কারবালার শোকাবহ ঘটনাসহ উমাইয়া দুঃশাসনজনিত কারণে সৃষ্ট মুসলিম জনমনে যে বিক্ষোভের সঞ্চার হয় তা যেমন এই ধারার সাহিত্য সৃষ্টিতে ইন্ধন যোগায় তেমনি বিজয়ী আববাসীয় শাসকরাও একে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে সচেষ্ট হয়। এই উভয়বিধ কারণেই সমগ্র মুসলিম বিশ্বে মর্সিয়া সাহিত্য প্রসার লাভ করে। আরবী সাহিত্য থেকে মর্সিয়া কাব্য ফারসী সাহিত্যে স্থান পায়। উপমহাদেশে সুলতানী শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে ফারসি ভাষায় মর্সিয়া প্রচলিত হয় এবং পরে উর্দু ভাষাতেও তার প্রসার ঘটে। মর্সিয়া সাহিত্যের উৎপত্তি কারবালার বিষাদময় কাহিনী ভিত্তি করে হলেও তার মধ্যে আরো শোক ও বীরত্বের কাহিনীর অনুপ্রবেশ ঘটেছে। মুসলিম সমাজের খলিফাদের বিজয় অভিযানের বীরত্বব্যঞ্জক কাহিনীও এই শ্রেণীর কাব্যে স্থান পেয়েছে। ‘জঙ্গনামা' নামে বাংলা সাহিত্যে এ ধরনের কাব্য রচিত হয়েছে। মূলত আরবী মাগাজী কাব্য ধারা থেকে উর্দু জঙ্গনামা কাব্যের উৎপত্তি। উর্দু থেকেই বাংলা জঙ্গনামা কাব্যের উৎপত্তি হয়। বাংলা মর্সিয়া কাব্যগুলো প্রধানত অনুবাদ সাহিত্য হিসাবেও গড়ে উঠে। বাঙালী কবিরা মূলতঃ ফারসী ও উর্দু কাব্যের ভাব কল্পনা ও ছায়া আশ্রয় করে তাদের কাব্য রচনা করেছিলেন তথাপি এর মধ্যেও তাদের মৌলিকতার যথেষ্ট পরিচয় বিদ্যমান। ফলে এই কাব্যগুলো এক প্রকার অভিনব সৃষ্টি হয়ে দাঁড়িয়েছে সুদূর আরব পারস্যের কাহিনী কাব্যকার লিপিবদ্ধ করতে গিয়ে কবিরা যে বাকভঙ্গি ও পরিকল্পনার আশ্রয় গ্রহণ করেছেন তা অনেক ক্ষেত্রে অবাস্তব। এতে প্রমাণিত হয়, বাঙালী কবিরা মাটির প্রভাব অতিক্রম করতে পারেননি। সামগ্রিক মর্সিয়া সাহিত্যকে পৃথক চারটি ধারায় বিন্যস্ত করা যায়। প্রথম ধারা মধ্যযুগের (১২০০ - ১৮০০) ঐতিহ্যবাহী মর্সিয়া সাহিত্য। হামিদুল্লাহ, মোহাম্মদ খান এই ধারার কবি। দ্বিতীয় ধারা মিশ্র ভাষায় রচিত মর্সিয়া সাহিত্য। শাহ গরীবুল্লাহ, রাধা রমন গোপ এই ধারার অনুসারী। তৃতীয় ধারা আধুনিক বাংলায় রচিত মর্সিয়া সাহিত্য এর গদ্যধারায় সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন মীর মোশাররফ হোসেন, হামিদ আলী প্রমুখ এবং কাব্য ধারায় সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন কায়কোবাদ প্রমুখ। চতুর্থ ধারা হচ্ছে লোক সাহিত্যের ধারা। বাংলা মর্সিয়া সাহিত্যের আদি কবি সম্পর্কে নিশ্চিত করে কিছু বলার উপায় নেই। তবে শেখ ফয়জুল্লাকে এ ধারার প্রথম কবি বলে মনে করা হয়। তিনি ‘জয়নবের চৌতিশা' নামে কাব্যের রচয়িতা। কাব্যটি আকারে ছোট এবং কারবালার কাহিনীর একটি ছোট অংশ অবলম্বনে রচিত। কবির জীবনকাল ষোড়শ শতাব্দীর শেষার্ধ বলে মনে করা হয়। তিনি একজন প্রতিভাশালী কবি ছিলেন। দৌলত উজীর বাহরাম খান ‘ইমাম বিজয়ের' নামে কাব্য রচনা করেছিলেন। তিনি চট্টগ্রামের অধিবাসী ছিলেন। মোহাম্মদ খান ‘মক্তুল হোসেন' নামে কাব্য রচনা করে যথেষ্ট খ্যাতি লাভ করেছিলেন। এই কাব্যটি ফারসি মক্তুল হোসেন কাব্যের ভাবানুবাদ। তিনিও চট্টগ্রামের অধিবাসী ছিলেন। ১৬৪৫ খৃস্টাব্দের দিকে এটি রচিত হয়। এতে কবি প্রতিভার উৎকর্ষতা প্রকাশ পেয়েছে। এখানে করুণ রসের উৎকর্ষতা প্রকাশ পেয়েছে।

‘‘মোহাম্মদ খান কহে শুনিতে মুরম দহে পাষাণ হইয়া যায় জল’’ অষ্টাদশ শতকের কবি শেরবাজ ‘কাশিমের লড়াই' কাব্য রচনা করেছিলেন। কবির নিবাস ছিল ত্রিপুরা জেলায়। মহররমের একটি ক্ষুদ্র বিবরণী এ কাব্যে স্থান পেয়েছে। বিষয়বস্তু গতানুগতিক এবং তাতে কোন নতুনত্ব নেই। এই কাব্য ছাড়া তিনি ‘মল্লিকার হাজার সওয়াল' ও ‘ফাতেমার সুরতনামা' কাব্য রচনা করেছিলেন। অষ্টাদশ শতকের একজন বিশিষ্ট কবি হায়াত মাহমুদ। কবি রংপুর জেলার ঝাড়বিশিলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ‘জঙ্গনামা' কাব্য কবির প্রথম রচনা। কাব্য রচনাকাল ১৭২৩ খৃস্টাব্দ। কবির উদ্দেশ্য ছিল ইতিহাসের অনুকরণে কারবালা কাহিনী রচনা করা। সে জন্য কবি বলেন :

যতেক শুনিনু মুঞ্চি পুস্তক বয়াতে

কত আছে কত নাহি কিতাবের মতে।

.......................................

তাহা শুনি মনে মোর দ্বিধা সর্বক্ষণ

রচিনু পুস্তক তবে জানিতে কারণ

জাফর নামে একজন অজ্ঞাতনামা কবি ‘শহীদে কারবালা ও সখিনার বিলাপ' নামে মর্সিয়া কাব্য রচনা করেছিলেন। এতে কবির স্বাভাবিক প্রতিভার বিকাশ ঘটেছে। সম্ভবত অষ্টাদশ শতকের কোন এক সময় এ কাব্য রচনা করেন। অষ্টাদশ শতকের আর একজন কবি ছিলেন হামিদ। ‘সংগ্রাম হুসেন' নামে তিনি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ কাব্য রচনা করেছিলেন। ইংরেজ আমলে বিশেষত এর প্রথম অর্ধে বাংলা সাহিত্যে মর্সিয়া কাব্যের দ্বিতীয় ধারা অর্থাৎ মিশ্র ভাষায় রচিত কাব্য আত্মপ্রকাশ করে। ফকির গরীবুল্লাহ এই ধারার প্রধানতম কবি। মর্সিয়া বিষয়ক কাব্য ‘জঙ্গনামা' তার সমগ্র সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ রচনা। কবি ফারসী কাব্য অবলম্বনে জঙ্গনামা রচনা করেছিলেন। কবি এ কাব্যে যেমন একদিকে যুদ্ধের বর্ণনা দিয়েছেন তেমনি গভীর বেদনার সুর ফুটিয়ে তুলেছেন। কবি কল্পনা বাস্তব তার সীমা অতিক্রম করে নানা অলৌকিক বিষয়ের অবতারণা করেছেন। অলৌকিকতা কেবল নয় অসাধারণ ও অস্বাভাবিক বীর বিক্রম এ কাব্যে বড় হয়ে উঠেছে। এর পূর্বে মোহাম্মদ খান, হায়াত মাহমুদ মর্সিয়া কাব্য রচনা করলেও গরীবুল্লাহ এই ধারার সবচেয়ে জনপ্রিয় কবি। মর্সিয়া কাব্য বিষয়ে রাধাচরণ গোপ নামে একজন হিন্দু কবির নাম পাওয়া যায়। তিনি ‘ইমামগণের কেচ্ছা ও আফৎনামা' নামে দুটি কাব্য রচনা করেছিলেন। এগুলো অষ্টাদশ শতকে রচিত হয়েছিল বলে মনে করা হয়। মীর মোশাররফ হোসেনের ‘বিষাদ সিন্ধু' মর্সিয়া সাহিত্যের ধারায় উপন্যাস জাতীয় গ্রন্থ। আধুনিক উপন্যাসের সুবিন্যস্ত বন্ধন রীতি আলোচ্য গ্রন্থে অনুসরণ করা হয়নি। গ্রন্থটি ইতিহাস, উপন্যাস, সৃষ্টিধর্মী রচনা এবং নাটক ইত্যাদি সাহিত্যের বিবিধ সংমিশ্রণে রোমান্টিক আবেগ মাখানো এক সংকর সৃষ্টি। মীর মোশাররফ হোসেন অতীতের জঙ্গনামা, মক্তুল হোসেন, শহীদে কারবালা প্রভৃতি কাব্যের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। সে সব গ্রন্থের কল্পনা বহুল কাহিনী দ্বারা তিনি ছিলেন প্রভারিত। তার এই উপন্যাস রূপায়নে ও চরিত্র চিত্রণে এই বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। এর কিছু প্রধান চরিত্র ছাড়া অপরাপর চরিত্র ইতিহাস বহির্ভূত ও কল্পনাশ্রয়ী। ঘটনা বিন্যাসে প্রথমদিকে সামান্য ঐক্য পরিলক্ষিত হলেও পরের দিকে ব্যাপকভাবে কল্পনানির্ভর। অন্যদিকে মর্সিয়া সাহিত্যের ধারায় হামিদ আলী ঊনিশ শতকীয় মহাকাব্যের রীতিতে কাশেম বধ কাব্য রচনা করেন। চরিত্র সৃষ্টি, ঘটনা বিন্যাস এ কাব্য মহাশ্মশান তো বটেই এমনকি অনেক ক্ষেত্রে বৃত্রসংহারের চেয়ে শ্রেষ্ঠ\ এই কাব্যে কবির দুর্লভ সংযম, প্রদীপ্ত বুদ্ধি ও চমৎকার কবিত্ব শক্তির পরিচয় পাওয়া যায়। কবির পরবর্তী রচনা ‘জয়নালোঘারে কাব্য'। কাশেম বধ কাব্যে যা বর্ণিত হয়েছে তার পরবর্তী ঘটনাবলীই এ কাব্যের বর্ণিতব্য বিষয়। মাইকেলের ব্যাপক প্রভাব এতে লক্ষণীয়। এই ধারার সর্বশেষ সংযোজন হলো কায়কোবাদের ‘মহরম শরীফ' কাব্য। এই কাব্যে কবি তার সহজাত ইতিহাসপ্রীতি, স্বজাত্যবোধ ও নীতিজ্ঞানের পরিচয় দিয়েছেন। কিন্তু কাব্যকলার উৎকর্ষ সাধন তিনি করতে পারেননি। মর্সিয়া সাহিত্যের আলোচনায় যার কথা সবার শেষে আসে তা হচ্ছে লোকসাহিত্যের অন্তর্গত মর্সিয়া কাব্য। জারি গান এই সাহিত্যের পর্যায়ভুক্ত। অন্যান্য লোকসাহিত্যের মতো এর জন্ম ময়মনসিংহের পূর্বাঞ্চলে। বিষয়ের বৈচিত্র্য, সুরের মাধুর্যে এবং শোকের গভীরতায় এই মর্সিয়া গীতি প্রচলিত কাব্যের চেয়ে উৎকৃষ্টতর দাবি রাখে।

সুত্রঃ দৈনিক সংগ্রাম

মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে 'মর্সিয়া সাহিত্য' নামে এক ধরনের শোককাব্য বিস্তৃত অঙ্গন জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে। এমন কি তার বিয়োগাত্মক ভাবধারার প্রভাবে আধুনিক যুগের পরিধিতেও তা ভিন্ন আঙ্গিকে এসে উপনীত হয়েছে। শোক বিষয়ক ঘটনা অবলম্বনে সাহিত্যসৃষ্টি বিশ্ব সাহিত্যের প্রাচীন রীতি হিসেবে বিবেচিত। 'মর্সিয়া' কথাটি আরবি, এর অর্থ শোক প্রকাশ করা। আরবি সাহিত্যে মর্সিয়ার উদ্ভব নানা ধরনের শোকাবহ ঘটনা থেকে হলেও পরে তা কারবালা প্রান্তরে নিহত ইমাম হোসেন ও অন্যান্য শহীদকে উপজীব্য করে লেখা কবিতা মর্সিয়া নামে আখ্যাত হয়। আরবি সাহিত্য থেকে মর্সিয়া কাব্য ফারসি সাহিত্যে স্থান পায়। ভারতে মোগল শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে এদেশে ফারসি ভাষায় মর্সিয়া প্রচলিত হয় এবং পরে উর্দু ভাষাতেও তার প্রসার ঘটে। এসব আদর্শ অনুসরণ করে বাংলা ভাষায় মর্সিয়া সাহিত্যের প্রচলন হয়। ভারতে বিভিন্ন ভাষায় মর্সিয়া সাহিত্যের প্রচলনের পিছনে পারস্য দেশীয় বণিক, দরবেশ, পণ্ডিত, কবি প্রমুখের অনুপ্রেরণা বিশেষ ভাবে কাজ করেছে।

এসব কাব্যের কোন কোনটি যুদ্ধ কাব্য হিসেবে বিবেচনার যোগ্য। যুদ্ধের কাহিনি নিয়ে কোন কোনটি পরিণতিতে চরম বিয়োগাত্মক রূপ গ্রহণ করেছে। শেষে কাব্য হয়ে উঠেছে মর্সিয়া বা শোক কাব্য। কোথাও কোথাও যুদ্ধকাহিনি নিয়ে রচিত হয়েছে জঙ্গনামা। কারবালার বিষাদময় কাহিনিতে যুদ্ধের ঘটনা যত প্রাধান্য পেয়েছে তার চেয়ে বেশি পেয়েছে শোকের অনুভূতি। এ প্রসঙ্গে ড. গোলাম সাকলায়েন মন্তব্য করেছেন, ‘জঙ্গনামা বা যুদ্ধকাহিনি-সংবলিত কাব্যগুলি মুসলিম কবিসৃষ্ট সাহিত্যধারার মধ্যে নানাকারণে বৈশিষ্ট্যের দাবি করতে পারে। কারবালা-যুদ্ধভিত্তিক কাব্যনির্মাণ সেকালের কবিদের কাছে ফ্যাশান হিসাবে গণ্য হতো এবং সেটা প্রলোভনের ব্যাপারও ছিল। তার কারণ সুস্পষ্ট। মুহরম মাস এলেই বাংলার গ্রামে-গঞ্জে মুসলমানদের মন বেদনাকরুণ পুথিপাঠের আসর বসাতো আর সেইজন্য কবিরাও কারবালার করুণ কাহিনি নিয়ে শহীদে কারবালা, জঙ্গনামা, হানিফার লড়াই ইত্যাদি কাব্য লেখার তাগিদ বোধ করতেন।'

মর্সিয়া কাব্য বা শোক কাব্যের পটভূমিকা বর্ণনা করতে গিয়ে ড. আহমদ শরীফ লিখেছেন, 'যুদ্ধ কাব্যের মধ্যে কারবালাযুদ্ধ কাব্যই ষোল-সতের শতক থেকে বাংলার মুসলিম সমাজে বিশেষ জনপ্রিয় হতে থাকে। তার কারণ দাক্ষিণাত্যের বাহমনিরাজ্যে- বিজাপুরে-বিদরে-বেরারে-গোলকুণ্ডায়-আহমদনগরে ইরানি বংশজ শিয়ারাই সুলতান ও শাসকগোষ্ঠী ছিলেন। শিয়ারা কারবালা যুদ্ধকে স্মরণ করা অবশ্য পালনীয় ধর্মীয় পার্বণ বলেই জানে। চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে দাক্ষিণাত্যের শিয়াদের ও ইরানি শিয়াদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল, সে সূত্রে ষোল শতক থেকেই চট্টগ্রাম অঞ্চলে 'মাতুল হোসেন' (হোসেন নিধন) কাব্য রচিত হতে থাকে, তারপর শিয়া সাক্ষাতী-শাসিত ইরানে আশ্রিত হুমায়ুনের দিল্লি প্রত্যাবর্তনের পরে দরবারসূত্রে ইরানের ও ইরানীয় প্রভাব প্রবল ও সর্বব্যাপী হতে থাকে। আবার আঠার শতকে সাফাতী রাজত্বের অবসানে ভারতে বাংলায় আশ্রিত শিয়া ইরানিদের প্রভাবে মুহররম তাজিয়াদি সহ একটি জনপ্রিয় জাতীয় পার্বণের মর্যাদায় স্থায়ী প্রতিষ্ঠা পায়।

মোগল আমলে মুর্শিদাবাদ, ঢাকা প্রভৃতি অঞ্চলে শিয়া শাসক ও আমীর ওমরাগণ শাসনকার্য উপলক্ষে এসে বসবাস করতেন। মুসলমানদের মধ্যে শিয়া সম্প্রদায়ের লোকেরা মর্সিয়া সাহিত্য বিকাশের প্রেরণা দান করেন। তৎকালীন শিয়া শাসকরা কবিগণকে উৎসাহ প্রদান করতেন। অনেক কবি মুর্শিদাবাদের নবাবের মনোরঞ্জনের জন্য মর্সিয়া রচনায় আত্মনিয়োগ করতেন।

মর্সিয়া সাহিত্যের উৎপত্তি সম্পর্কে ড. আহমদ শরীফ মন্তব্য করেছেন, 'যদিও ইমাম হাসান-হোসেনের প্রতি সমকালে হযরত আলীর ভক্ত-অনুগতদের ছাড়া আর কারও তেমন সমর্থন সহানুভূতি ছিল না, তবু কালক্রমে আল্লাহর বান্দা ও রসুলের নাতি বলেই মুসলিম মাত্রই হাসান-হোসেনের ভক্ত-সমর্থক এবং মুয়াবিয়া-এজিদের নিন্দুক হয়ে ওঠে। যেহেতু পরবর্তী কালে মুসলিমমাত্রই রসুলের আত্মীয় বলে তাঁর হতভাগ্য দৌহিত্রদের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে ওঠে, অর্থাৎ পরাজিত পক্ষের সমর্থক হয়ে যায়, যেহেতু নায়ক বিজয়গৌরব হীন, সেহেতু তার প্রধান রস করুণ হতেই হয়—শোকের বা কান্নার আধার বলেই এ বিলাপ-প্রধান সাহিত্যের নাম 'মর্সিয়া সাহিত্য বা শোক সাহিত্য।'

মর্সিয়া সাহিত্যের উৎপত্তি কারবালার বিষাদময় কাহিনি ভিত্তি করে হলেও তার মধ্যে অন্যান্য শোক ও বীরত্বের কাহিনির অনুপ্রবেশ ঘটেছে। মুসলিম সাম্রাজ্যের খলিফাগণের বিজয় অভিযানের বীরত্বব্যঞ্জক কাহিনিও এই শ্রেণির কাব্যে স্থান পেয়েছে। 'জঙ্গনামা' নামে বাংলা সাহিত্যে এ ধরনের কাব্য রচিত হয়েছে। মর্সিয়া সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ড. গোলাম সাকলায়েন তাঁর 'বাংলায় মর্সিয়া সাহিত্য' গ্রন্থে মন্তব্য করেছেন, 'এই কাব্যগুলির মাধ্যমে বাঙালি মুসলমান তাঁহাদের প্রাণের কথা প্রতিধ্বনিত হইতে শুনিলেন ও তাঁহারা ইহার মারফত অতীত ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করিতে শিখিলেন। বাংলা মর্সিয়া কাব্যগুলি প্রধানত অনুবাদ সাহিত্য হিসাবেই গড়িয়া উঠে। বাঙালি কবিগণ যদিও মূলত ফারসি ও উর্দু কাব্যগুলির ভাবকল্পনা ও ছায়া আশ্রয় করিয়া তাহাদের কাব্যাদি রচনা করিয়াছিলেন তথাপি এগুলির মধ্যে তাঁহাদের মৌলিকতার যথেষ্ট পরিচয় বিদ্যমান। ফলে এই কাব্যগুলি এক প্রকার অভিনব সৃষ্টি হইয়া দাঁড়াইয়াছে। সুদূর আরব পারস্যের মানুষের কাহিনি কাব্যাকারে লিপিবদ্ধ করিতে গিয়া কবিগণ যে বাগভঙ্গি ও পরিকল্পনার আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছেন তাহা অনেক ক্ষেত্রে অবাস্তব ও উদ্ভট হইয়াছে। ইহাতে মনে হয়, বাঙালি কবিগণ মাটির প্রভাব অতিক্রম করিতে পারেন নাই।'

মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে 'মর্সিয়া সাহিত্য' শোককাব্যের একটি জনপ্রিয় শাখা। আরবি শব্দ 'মর্সিয়া' অর্থ শোক প্রকাশ করা, যা আরবি সাহিত্যে উদ্ভব লাভ করে কারবালার যুদ্ধ ও শহীদ ইমাম হোসেনের কাহিনী অবলম্বনে। ফারসি সাহিত্য ও পরে উর্দুতে এর প্রসার ঘটলে, বাংলা ভাষায়ও মর্সিয়া সাহিত্যের জন্ম হয়।

শোক ও যুদ্ধ কাহিনির ভিত্তিতে লেখা এসব কবিতা বাংলায় বিশেষভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, বিশেষ করে ষোল ও সতেরো শতকে। ড. গোলাম সাকলায়েন মন্তব্য করেছেন যে, মর্সিয়া সাহিত্য মুসলিম কবিদের সৃষ্টি ও পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে। তা ছাড়া ড. আহমদ শরীফ মর্সিয়া সাহিত্যের উৎপত্তি ও এর বৈশিষ্ট্য নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।

  • মর্সিয়া সাহিত্যের উৎস: কারবালার কাহিনির প্রভাব।
  • শোক ও বিয়োগাত্মক কাহিনির অনুপ্রবেশ।
  • বাঙালি কবিরা ফারসি ও উর্দু কাব্যের ছায়ায় তাদের কাব্য রচনা করেছেন।
  • মাসকুলিন ভাবনা ও সমাজের প্রতি অধিকৃত আবেগ খুঁজে পাওয়া গেছে।

মর্সিয়া সাহিত্য বাংলা মুসলমানদের মধ্যে নানা ধরনের আবেগের প্রতিনিধিত্ব করে এবং সাহিত্যের শৈলীতে এক ধরনের মৌলিকতা প্রতিফলিত করে।

Related Question

View All
Updated: 3 weeks ago
  • আনন্দ গীতি
  • লোক গীতি
  • শোক গীতি
  • লালন গীতি
31
Updated: 3 months ago
  • ধ্বনিতত্ত্ব
    0%
    0 votes
  • অর্থতত্ত্ব
    0%
    0 votes
  • রূপতত্ত্ব
    67%
    2 votes
  • বাক্যতত্ত্ব
    33%
    1 votes
116
Updated: 5 months ago
  • শোক বা আহাজারি
  • বেদনা মিশ্রিত কাব্য
  • শোক কাব্য
  • দুঃখ
498
Updated: 1 week ago
  • ব্যাক্তিগত দঃখের কাহিনী কাব্য
  • কারবালার কাহিনি নিয়ে রচিত কাব্য
  • মধ্যযুগের শেষ পর্যায়ের কবিদের কলমযুদ্ধ
  • মসুয়া সম্প্রদায়ের সাহিত্য
116
Updated: 5 months ago
  • হায়াত মাহমুদ
  • মুহম্মদ খান
  • জাফর
  • মুহম্মদ কবীর
279
  • আরবি
  • উর্দু
  • ফারসি
  • তুর্কি
789
শিক্ষকদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি

১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!

শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!

প্রশ্ন এডিট করা যাবে
জলছাপ দেয়া যাবে
ঠিকানা যুক্ত করা যাবে
Logo, Motto যুক্ত হবে
অটো প্রতিষ্ঠানের নাম
অটো সময়, পূর্ণমান
প্রশ্ন এডিট করা যাবে
জলছাপ দেয়া যাবে
ঠিকানা যুক্ত করা যাবে
Logo, Motto যুক্ত হবে
অটো প্রতিষ্ঠানের নাম
অটো সময়, পূর্ণমান
অটো নির্দেশনা (এডিটযোগ্য)
অটো বিষয় ও অধ্যায়
OMR সংযুক্ত করা যাবে
ফন্ট, কলাম, ডিভাইডার
প্রশ্ন/অপশন স্টাইল পরিবর্তন
সেট কোড, বিষয় কোড
অটো নির্দেশনা (এডিটযোগ্য)
অটো বিষয় ও অধ্যায়
OMR সংযুক্ত করা যাবে
ফন্ট, কলাম, ডিভাইডার
প্রশ্ন/অপশন স্টাইল পরিবর্তন
সেট কোড, বিষয় কোড
এখনই শুরু করুন ডেমো দেখুন
৫০,০০০+
শিক্ষক
৩০ লক্ষ+
প্রশ্নপত্র
মাত্র ১৫ পয়সায় প্রশ্নপত্র
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন তৈরি করুন আজই

Complete Exam
Preparation

Learn, practice, analyse and improve

1M+ downloads
4.6 · 8k+ Reviews

Question Analytics

মোট উত্তরদাতা

জন

সঠিক
ভুল
উত্তর নেই